• রবি. মার্চ ৭, ২০২১

অনুসন্ধানবার্তা

অজানাকে জানতে চোখ রাখুন

ইতিহাসের সবচেয়ে বড় খলনায়ক হিটলার

Byঅনুসন্ধান বার্তা

অক্টো ২৫, ২০২০
0 0
Read Time:11 Minute, 15 Second

সালামুন ইব্রহিম, ইতিহাস বিষয়ক রিপোর্টার,অনুসন্ধান বার্তা,ঢাকা অফিস

যদি সূর্যের মত আলো ছড়াতে চাও আগে এর মত জ্বলতে হবে।

—অ্যাডলফ হিটলার

এমন কথার মানুষটি যে ইতিহাসে কতটা ঘৃনীত তা যুগে যুগে সকলের জানা। ইতিহাসের খারাপ মানুষগুলোর বা খলনায়কদের কোন তালিকা করা হলে নিঃস্বন্দেহে তা শুরু হবে হিটলারের নাম দিয়ে। যে মানুষ্টির জন্য কোটি সংখ্যক মানুষের মৃত্যু হয়, শুরু হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, নাৎসি বাহিনীর প্রধান এই কুখ্যাত ঘাতক ০৩ বছরে হত্যা করে ৬০ লাখেরও বেশি ইহুদী। রাজনৈতিক জীবনের শুরু থেকেই তার ইহুদী বিদ্বেশের মনোভাব ছড়িয়ে পড়ে পুরো জার্মান জুরে।

হিটলারের আগের পূর্বপুরুষ আফ্রিকার অধিবাসী ছিল। মাতা ক্লারা পল হিটলার ও পিতা এলিয়স হিটলারের সন্তান অ্যাডলফ হিটলারের জন্ম ১৮৮৯ সালের ২০ এপ্রিল অস্ট্রিয়ায়। পরবর্তিতে জার্মানীতে পারি জমান ইতিহাসের এই কুখ্যাত খলনায়ক।
হিটলারের বাবা-মায়ের মোট ছয়টি সন্তান ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে অ্যাডলফ ও তার বোন পলাই পূর্ণ বয়স্ক হতে পেরেছেন। বাকি চারজন শিশুকালেই মারা যান। অ্যাডলফের জন্মের আগে ডিপথেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে গুস্তাভ এবং আইডা মৃত্যুবরণ করেন। হাইড্রোসেফালাসে আক্রান্ত হয়ে তার আরেক ভাই অট্টো মৃত্যুবরণ করেন। ৬ বছর বয়সে অ্যাডমন্ড নামে আরেক ভাই মৃত্যুবরণ করেন ১৯০০ সালে।
ছোট থেকেই ছবি আঁকার প্রতি যথেষ্ট আগ্রহ ছিল তার। কোন কোন বর্ণনায় জানা যায় যে ধর্মগুরু হতে চেয়েছিলেন তিনি।
১৯০৩ সালে মারা যান তার পিতা আর ১৯০৭ সালের ডিসেম্বরে মারা যান তার মা।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যোগদান করেন সৈনিক হিসাবে, পরে রাজনীতিতে যোগদান করলেও তিনি প্রথমবারের মত নির্বাচনে হেরে যান কিন্ত পরবর্তিতে এই
অস্ট্রীয় বংশোদ্ভূত জার্মান রাজনীতিবিদ নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ন্যাশনাল সোশ্যালিস্ট জার্মান ওয়ার্কার্স পার্টি। পরবর্তিতে তা নাৎসিতে রুপ নেয় যা জার্মান এবং বেশিরভাব ইউরোপের জন্য ছিল তৎকালীন সময়ে সব থেকে বড় ত্রাস। ১৯২০ সালেই একটি ডানপন্থী সরকার প্রতিষ্ঠা করার জন্য বার্লিনে সামরিক ক্যু করার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু এই ক্যু ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।

তিনি আত্মজীবনীমূলক একটি বই লিখেন, নাম দেন মাইন কেম্প (আমার সংগ্রাম)। জেলে বসেই লিখেন মাইন কেম্প বইটি। ১৯২৫ সালে জুলাই ১৮-তে মাইন কেম্প বইটি প্রকাশিত হয়। যার দ্বিতীয় খণ্ড প্রকাশিত হয় ১৯২৬ সালে।
১৯৩৪-১৯৩৫ সালে নিজেকে সুপ্রীম কোর্টের জজ ঘোষনা করেন, একই সময় নিজেকে জার্মানীর প্রেসিডেন্ট ও ঘোষনা দেন। সর্বোপরি একটি সমগ্রতাবাদী ও ফ্যাসিবাদী একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠা করে বিশ্বজুরে কুখ্যাতি অর্জন করে এই হিটলার।
তার শাসনামলের শুরুতেই হিটলার “লেবেনস্রাউম” (জীবন্ত অঞ্চল) নামে বৈদেশিক নীতি গ্রহন করে সমস্ত বিশ্বকে একত্রিত করার স্বপ্নে তা দখল করতে শুরু করে দেয়।
তার অভাবনীয় বক্তব্যের জন্য খুব অল্প সময়ের মধ্যেই জার্মানদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে হিটলার। পরবর্তিতে ‘হলকস্ট’ নামে এক নৃশংস হত্যাযজ্ঞ চালায় ইহুদী সম্প্রদায়ের ওপর। ইউরোপের একটা বড় অংশের ইহুদী সম্প্রদায় ও অন্য অনেক সাধারন মানুষকে নিতান্তই তুচ্ছ কিছু কারন দেখিয়ে হত্যা করে হিটলার। তার এই নৃশংসতায় কোটি সংখ্যক মানুষকে হত্যা করা হয় যার মধ্য ৬০ লাখেরও বেশি ছিল ইহুদী

মজার তথ্য হল এই নৃশংস হত্যাকারী হিটলার ছিলেন একজন নিরামিষ ভোজী। তার সাথে তিনি অনেক নীতিমালা প্রনয়ন করেন পশু হত্যার বিপক্ষে। অথচ মানুষ হত্যার দিক দিয়ে তার সমকক্ষ ইতিহাসে আর খুঁজে পাওয়া যায় না।
হিটলারের প্রথম প্রেম ছিল স্টেফানি রাবেচ নামের ইহুদী মেয়ে। বর্তমান গবেষণায় জানা যায় যে তার দাদা নিজেও ছিলেন ছিলেন একজন ইহুদী।
শুধু হত্যাকান্ডের জন্যই নয়, বরং নিজের ব্যতিক্রম গোঁফের জন্যও বিখ্যাত ছিলেন। তিনি মনে করতেন এটাই একসময় মানুষের ফ্যাশন হয়ে যাবে, এটা তার খুব পছন্দের ছিল। কমেডির জন্য বিখ্যাত চরিত্র চার্লি চ্যাপ্লিন তার মতই গোঁফের অধিকারী ছিলেন। যদিও তাদের মধ্যে কোন সম্পর্কের সন্ধান পাওয়া যায় না। চার্লি চ্যাপ্লিন ও অ্যাডলফ হিটলার একই সালে একই মাসে জন্ম নেন, উভয়ের জন্ম ১৮৮৯ সালের এপ্রিলে। তবে চার্লি চ্যাপ্লিন ছিলেন তার ৪ দিনের বড়।

এক জার্মান ডাক্তার ধূমপান ও ফুসফুস ক্যান্সারের মধ্যে নিবিড় সম্পর্ক আবিষ্কারের পর ধূমপানের ঘোর বিরোধী হয়ে পড়েন হিটলার। ১৯৩০ সালে তিনিই প্রথম অ্যান্টি- স্মোকিং ক্যাম্পেইন করেন ও বলেন-

Smoking is injurious to health

যা আমরা এখনকার দিনে আমাদের সিগারেট প্যাকেটের গায়ে দেখতে পাই। পরবর্তিতে নিজস্ব মিলিটারিদের মধ্যেও কঠোরভাবে ধূমপান নিষিদ্ধ করেন হিটলার।

পাঁচ দিন কাজ আর দুই দিন বিশ্রাম

এই মতবাদটির প্রবক্তাও হলেন হিটলার। তিনিই জার্মানীতে পাঁচদিন কাজ ও দুই দিনের ছুটি ঘোষনা করেন। নিজ দেশে ক্রিকেট খেলাকেও নিষিদ্ধ করে হিটলার।

অধিকাংশ মানুষই জানে ইভা ব্রাউন নামে একজন নারী ছিলেন হিটলারের স্ত্রী। কিন্তু অনেকেই জানেন না তারা বিবাহিত হিসেবে থাকতে পেরেছিলেন মাত্র একদিন। অবিবাহিত অবস্থায় তারা অনেকদিন একসাথে ছিলেন। কোনো সন্তান হয়নি তাদের। হিটলারের চেয়ে প্রায় ২০ বছরের ছোট ছিলেন ইভা। ১৭ বছর বয়সী ইভার সঙ্গে পরিচয়ের সময় হিটলার ছিলেন ৪০ বছরের। বয়সের এমন পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও তার প্রতি খুব আন্তরিকতা ছিল। তার একাধিক প্রেমিকা আত্মহত্যা করেন বলে জানা যায়। অবশেষে ১৯৪৫ সালে হিটলার নিঃসন্তান হিসেবেই ইভার সাথে আত্মহত্যার মাধ্যমে পৃথিবী ত্যাগ করেন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের কারণে ঘৃণিত এই ব্যক্তিকে কম করে হলেও ২৭ বার হত্যার চেষ্টা চালানো হয়েছে! বলা বাহুল্য কোনবারই হিটলারকে মারতে সক্ষম হয়নি কেও।
১৯৩৩ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত জার্মানির চ্যান্সেলর এবং ১৯৩৪ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত সে দেশের ফিউরার ছিলেন। সেই সাথে ইতিহাসের পাতায় সর্বকালের সবচেয়ে নিন্দিত ও আলোচিত স্বৈরশাসক হয়ে ওঠে।
ভাইপো উইলিয়াম প্যাট্রিক হিটলার নিজের নাম পাল্টিয়ে হয়ে যান ‘উইলিয়াম স্টুয়ার্ট হিউস্টন’। তার সন্তান সন্ততির নামও স্টুয়ার্ট হিউস্টন দিয়েই রাখেন। হিটলারের ভয়ে জার্মান থকে পালিয়ে চলে যান যুক্তরাষ্ট্রে, জানা যায় বিশেষ সুপারিশক্রমে তিমি যুক্তরাষ্ট্রের নোবাহিনীতে যোগদান করেন এবং নিজ চাচার বিরুদ্ধে যুদ্ধেরত হন। পরবর্তীতে তাকে বিশেষ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা দেয়া হয়।
১৯৩৯ এ নোবেলের জন্য মনোনয়ন পান হিটলার। কিন্ত পরবর্তিতে তা প্রত্যাখান করে নেয়া হয়।

জানা যায় যে নানাবিধ গবেষনার জন্য নির্দয়ভাবে অনেক প্রান ও সম্পদ পরীক্ষার জন্য অনুমতি দেন হিটলার। অনেক শিশুর ওপরও চলানো হয় তার বৈজ্ঞানিক এক্সপেরিমেন্ট যার ফলে মারা যায় অনেকেই। পারমানবিক বিস্ফোরনের অনেক বড় একটা পরিকল্পনা ছিল তার এমনটাই জানা যায়। সেই সাথে ফিলাডেলফিয়া এক্সপেরিমেন্ট এর মত ভয়াবহ অনেক বিষয়ের সাথে হিটলারের নাম জড়িত।
হিটলারের অনেক আদর্শনীয় দিক থাকলেও নৃশংস হত্যাকান্ডের জন্য চিরকাল মানুষের কাছে ইতিহাসের সেরা খলনায়ক হয়ে থাকবে। তার মত এমন স্বৈরশাসক ও ঘাতক ইতিহাসে আর দ্বিতীয়টি দেখা যায় না।

Happy
Happy
0 %
Sad
Sad
0 %
Excited
Excited
0 %
Sleepy
Sleepy
0 %
Angry
Angry
0 %
Surprise
Surprise
0 %
error: Content is protected !!